গাজীপুর প্রতিনিধি:: গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহজে, স্বল্প খরচে ও দ্রুত ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গাজীপুর সদর উপজেলার ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালত বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদ সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. সালাউদ্দিন সরকার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী রুবি আক্তার। সভায় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুরে ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পের জেলা ব্যবস্থাপক মোছা. সাবিনা ইয়াসমীন। এ ছাড়া ভাওয়ালগড় ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনের সদস্যবৃন্দ, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং সাংবাদিক আবু বকর ছিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন। সভায় গ্রাম আদালতের উদ্দেশ্য, কার্যক্রম, এখতিয়ার, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া এবং সাধারণ মানুষের জন্য এর সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, গ্রাম আদালতের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছে দেওয়া। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলা-মোকদ্দমা, আদালতে যাতায়াত এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব। মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, গ্রাম আদালতে নির্দিষ্ট কিছু দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। এসবের মধ্যে ছোটখাটো মারামারি, চুরি, সম্পত্তির ক্ষতি, ফসলের ক্ষতি, জমি বা সীমানা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিরোধসহ আইনে তফসিলভুক্ত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গ্রাম আদালতে মামলা দায়েরের খরচও তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার জন্য ১০ টাকা এবং দেওয়ানি মামলার জন্য ২০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে। গ্রাম আদালতে পক্ষগুলো নিজের বক্তব্য নিজেরাই উপস্থাপন করতে পারেন এবং আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন হয় না। ফলে সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুই-ই সাশ্রয় হয়। সভায় গ্রাম আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কেও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬ অনুযায়ী আইনে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে অনধিক ৩ লাখ টাকা মূল্যমানের ছোটখাটো দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ গ্রাম আদালতের আওতায় নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। তবে সব ধরনের মামলা গ্রাম আদালতে বিচারযোগ্য নয়। গুরুতর অপরাধ এবং আইনে গ্রাম আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখা বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী উপযুক্ত আদালতেই নিষ্পত্তি করতে হয়। একইভাবে আইনে নির্ধারিত কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতেও মামলা গ্রাম আদালতে বিচারযোগ্য হয় না। সভায় বক্তারা বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকায় গ্রাম আদালত শুধু বিচারপ্রাপ্তির পথ সহজ করে না, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতেও ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিনের মামলা-মোকদ্দমার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি বা বিরোধ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকায় পারস্পরিক সমঝোতা ও সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়। গ্রাম আদালত ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক একটি স্থানীয় বিচারব্যবস্থা। আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে অপরাধ সংঘটিত হলে বা মামলার কারণ সৃষ্টি হলে নির্ধারিত শর্তে ওই ইউনিয়নে গ্রাম আদালত গঠিত হতে পারে। মতবিনিময় সভায় নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আইনি অধিকার সম্পর্কেও সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, আইনি অধিকার সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি নারীদের বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দকে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার ও সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানানো হয়। সভায় বক্তারা বলেন, কোনো ছোটখাটো বিরোধ বা আইনে গ্রাম আদালতের আওতাভুক্ত বিষয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা নিয়ে অযথা হয়রানি বা সংঘাতে না জড়িয়ে আইনসম্মতভাবে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে মানুষকে গ্রাম আদালতের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও সক্রিয় ও কার্যকর করতে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। এতে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখা সম্ভব। বক্তারা ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে গ্রাম আদালতের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও সক্রিয় ও কার্যকর করতে ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ‘বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (৩য় পর্যায়)’ প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম ২০২২-২০২৭ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে।