গাজীপুর প্রতিনিধি::দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির বৃত্ত ভেঙে অবশেষে চিরচেনা গতি ও কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে গাজীপুর জেলা পরিষদে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসক চৌধুরী ব্যারিস্টার ডক্টর ইশরাক আহমদ সিদ্দিকীর দিকনির্দেশনা এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নজরুল ইসলামের দূরদর্শী পরিকল্পনায় এটি একটি প্রকৃত জনকল্যাণমূলক সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিগত দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বহিরাগতদের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি ছিল গাজীপুর জেলা পরিষদ। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার সরকারি লক্ষ্য থাকলেও, তা সিন্ডিকেটের দুর্ভেদ্য দেয়ালে আটকে থাকত। বর্তমান প্রশাসনের অধীনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই অচলাবস্থা ভাঙতে শক্ত হাতে হাল ধরেন নতুন প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। জেলা পরিষদে সেবা নিতে আসা একাধিক সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, পূর্বে এই প্রতিষ্ঠানে যেকোনো ছোটখাটো সেবা বা ফাইলের কাজ করাতে গেলে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হতো। ‘কয়েক হাত ঘুরে’ এবং নির্দিষ্ট অঙ্কের পার্সেন্টেজ বা কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমেই কেবল কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলত। কিন্তু বর্তমান প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই পুরোনো ও কলঙ্কিত সিন্ডিকেট পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এখন সেবা প্রার্থীরা কোনো ধরনের মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের ঝামেলা ছাড়াই সরাসরি প্রশাসক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে দেখা করতে পারছেন। নিজেদের সমস্যা বা আবেদনের বিষয়ে সরাসরি কথা বলে তাৎক্ষণিক সমাধান পাচ্ছেন, যা পূর্বে সাধারণ মানুষের জন্য ছিল কল্পনাতীত।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক চৌধুরী ব্যারিস্টার ডক্টর ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও বনেদী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সততা জেলা পরিষদের সামগ্রিক কার্যক্রমে এক ধরনের আধুনিক ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নজরুল ইসলাম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের একজন অত্যন্ত সৎ, নিষ্ঠাবান এবং চৌকস কর্মকর্তা হিসেবে সুপরিচিত। জেলার সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতেই তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর এই দুই কর্মকর্তার যৌথ উদ্যোগে জেলা পরিষদে বেশ কিছু যুগান্তকারী ও সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দীর্ঘদিন ধরে একই চেয়ারে জেঁকে বসা এবং সিন্ডিকেট গড়ে তোলা বিতর্কিত কর্মচারীদের বিভিন্ন দপ্তরে বদলি করা। বছরের পর বছর একই কর্মস্থলে থেকে যারা অনিয়মের জাল বিস্তার করেছিলেন, এই প্রশাসনিক রদবদলের ফলে তাদের সেই চেইন ভেঙে গেছে। এই সাহসী উদ্যোগের পর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে কাজের প্রতি আন্তরিকতা এবং চঞ্চলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত সময়ে ব্যক্তিস্বার্থে জেলা পরিষদের সরকারি টাকা প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন দুর্বল ব্যাংকে এফডিআর (স্থায়ী আমানত) করে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে সেসব ব্যাংক প্রায় দেউলিয়ার পথে থাকায় সাধারণ গ্রাহকদের পক্ষে সেখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বর্তমান প্রশাসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দূরদর্শী চিন্তা ও অভিজ্ঞতার কারণে সঠিক সময়ে সেসব দুর্বল ব্যাংক থেকে সিংহভাগ টাকা উত্তোলন করে সরকারি ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছে। এর ফলে জেলা পরিষদের বিপুল পরিমাণ অর্থ নিশ্চিত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। জেলা পরিষদ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইতিমধ্যে ৬টি দুর্বল ব্যাংক পরিষদের টাকা দিতে গড়িমসি করছে এবং সেগুলো উদ্ধারে বর্তমানে জোরালো প্রশাসনিক ও আইনি চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আর্থিক খাতে এই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি জনসেবামূলক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে বর্তমান জেলা পরিষদ প্রশাসক জেলায় বেশ কিছু বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। জেলা পরিষদ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইতিমধ্যে জেলার আধুনিকায়নে ৪টি বৃহৎ মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কালিয়াকৈর বহুমুখী বাণিজ্যিক টাওয়ার নির্মাণ, আধুনিক নাগরিক সুবিধার জেলা পরিষদ টাওয়ার স্থাপন, শহরের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ভাওয়াল মার্কেটের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমে ৩য় তলা নির্মাণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য ও নান্দনিকতা বর্ধনে প্রধানমন্ত্রীর ফলজ ও বনজ গাছের বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন।মেগা প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সমগ্র জেলার ৫টি উপজেলায় ব্যাপক অবকাঠামোগত ও সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে জেলা জুড়ে ৩০০ কিলোমিটার রাস্তা মেরামত ও সংস্কার করে জনসাধারণের যাতায়াতের জন্য পুরোপুরি ব্যবহারোপযোগী করে তোলা হচ্ছে। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় প্রায় ৩৫০টি মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য বিশেষ অনুদান প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলাব্যাপী বিভিন্ন কবরস্থান ও শ্মশান সংস্কার করে ব্যবহার্য করার জন্য প্রকল্প প্রদান এবং মন্দির ও গির্জার উন্নয়নে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।জনকল্যাণমূলক ও মানবিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে সম্প্রতি শ্রীপুর ও কালিয়াকৈরে বন্যা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে নিবিড়ভাবে মানবিক ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া জেলাব্যাপী দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনামূল্যে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হচ্ছে। যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের খেলাধুলায় উদ্বুদ্ধ করতে এবং ক্রীড়া অনুরাগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলাব্যাপী ১,২০০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উন্নতমানের ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। একই সাথে সমাজের দুস্থ ও দরিদ্র নাগরিকদের জরুরি চিকিৎসা এবং আর্থিক কল্যাণে নিয়মিত অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে গৃহীত এই বহুমুখী উন্নয়ন উদ্যোগ জেলার সামগ্রিক চিত্র বদলে দেবে। এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, “জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণভাবে জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম, ফাইল আটকে রাখা বা দুর্নীতির স্থান হবে না। আমরা সরকারি নীতিমালা মেনে প্রতিটি সেবা যথাসময়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।”গাজীপুরের সুধী সমাজ ও সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন, প্রশাসনের এই কঠোর ও জনবান্ধব অবস্থান যদি অব্যাহত থাকে, তবে গাজীপুর জেলা পরিষদ সারা দেশের মধ্যে একটি মডেল জেলা পরিষদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।